পর্বঃ এক
আজকে থেকে শুরু হলো আমার কাশ্মির ভ্রমণের ধারাবাহিক গল্প। কয়েকটি পর্বে চলবে এই ভ্রমণ কাহিনী।
=======================
প্ল্যানটা ছিল বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই। কাশ্মির যাবো। হ্যাঁ, ভারত শাষিত কাশ্মিরের কথা বলছি। যা আমরা ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি পৃথিবীর স্বর্গ হিসেবে। মোগল সম্রাটা শাহজাহান বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে কোথাও যদি স্বর্গ থেকে থাকে, তবে তা এখানেই, এখানেই এখানেই।’
কাশ্মিরে যদিও এবার আমার দ্বিতীয়বার যাত্রা ছিল কিন্তু প্রথমবার মানে সেই ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আমি যে কাশ্মির গিয়েছিলাম, তখন আমি কাশ্মিরের সৌন্দর্য দেখে দেখে একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে সময়গুলো পার করেছিলাম। তাই দ্বিতীয়বার আমার আবার যাওয়া। কারণ এবার আমি নিজের সাথে একটি বোঝাপড়া করে নিয়েছিলাম। এবার ঠান্ডা মাথায় ধীরে সুস্থ্যে কাশ্মিরকে এক্সপ্লোর করবো। আর সেই গল্প সবার সাথে শেয়ার করবো। এই চিন্তা থেকেই দ্বিতীয়বার প্ল্যান করা। তবে প্রথমবার কাশ্মির থেকে বিদায় নিতে নিতেই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কাশ্মিরে আমি আবার আসবো।
আমাদের প্ল্যানটা ছিল অনেক আগে। আগে থেকে প্ল্যান করে সব কিছু বুকিং করে রাখলে নাকি হোটেল ভাড়া, বিমান এবং ট্রেন ভাড়া কিছুটা কমে পাওয়া যায়। তাই কিছুটা কমের আশায় আমরা প্ল্যান করি ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাস থেকেই। আর আমাদের টার্গেট ছিল ২০১৯ সালের রোজার ঈদের পর অর্থাৎ জুন মাসে আমরা কাশ্মির যাবো। চিন্তা করতে পারেন, পুরো ছয়মাস আগে থেকে প্ল্যান।
আমাদের এই প্ল্যানের শুরুতে কাশ্মির যেতে আগ্রহী সদস্যের সংখ্যা ছিল ১৮/২০ জনের মত। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা কমতে কমতে তিনমাস আগে এসে দাঁড়ালো ১২ জনে। বলতে পারেন, তিনমাস আগে আমরা আমাদের সদস্য সংখ্যা ১২ জনে লক করে দিলাম। কারণ আমরা তখন ট্রেন এবং বিমানের টিকিট বুকিং করতে চাচ্ছিলাম। মোটামুটি দুই থেকে তিনমাস আগে টিকিট করে ফেলতে পারলে নাকি অনেকটাই কমে পাওয়া যায়। তো সেই মতই আমরা কাজ শুরু করলাম।
আমাদের প্ল্যানটা ছিল দুইটি ওয়েতে। প্রথমত, আমরা ঢাকা থেকে পুরো কাশ্মির পর্যন্ত যাবো বাই রোডে। আর কাশ্মির থেকে ঢাকা পর্যন্ত আমরা পুরোটা ফিরবো বাই এয়ারে।
ঢাকা থেকে আমরা বাসে করে বেনাপোল বর্ডার পার হয়ে প্রথমে যাবো কোলকাতায়। কোলকাতায় আমরা একরাত স্টে করে পরদিন বিকাল ৪:৫০ মিনিটের রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে আমরা যাবো দিল্লি। দিল্লিতে একরাত স্টে করে পরদিন আমরা যাবো আগ্রার তাজমহল দেখতে। আগ্রার তাজমহল দেখা শেষ করে দিল্লি ব্যাক করে ঐদিনই আমরা দূরন্ত এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে চলে যাবো জম্মু। পরদিন জম্মু পৌঁছে ভাড়া করা মিনি ট্রাভেল বাস নিয়ে আমরা চলে যাবো শ্রীনগর। এভাবেই আমরা আমাদের বাইরোডে যাওয়ার প্ল্যানটা সাজালাম। আমরা কোলকাতা থেকে ফ্লাইটে করে দিল্লি যেতে পারতাম। কারণ ট্রেনের ভাড়া আর ফ্লাইটের ভাড়া খুব বেশি কম বেশি ছিলনা। কিন্তু আমরা তা করিনি। কারণ আমরা ইনটেনশনালি চাচ্ছিলাম, শেয়ালদহ থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসের দিল্লি যাওয়ার এক্সপেরিয়েন্সটা নিতে। এটা আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল। ট্রেন চলবে রাতের অন্ধকার চিরে ঝিকঝিক শব্দে। আমরা সবাই মিলে গল্প করবো। চা খাবো। কার্ড খেলবো। গান বাজনা করবো। মাঝে মাঝে অপরিচিত স্টেশনে এসে ট্রেন থামলে কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরে অবাক তাকিয়ে দেখবো নতুন মানুষজন, নতুন স্থান। এইরকম আরো কত স্বপ্ন। সেটাকেই আমরা বাস্তবে রূপ দিতে চাচ্ছিলাম।
আর দিল্লি যেহেতু আমরা যাচ্ছিই, তাই সেখানে একরাত স্টে করে পরদিন আগ্রার তাজমহল এবং আগ্রাফোর্টটাও আমরা ভিজিট করেই যেতে চাচ্ছিলাম। সেই সাথে যদি সম্ভব হয় দিল্লি শহরটাও একটু দেখে নিলাম। আর আসার সময় যেহেতু সবাই ক্লান্ত থাকবো। মনটাও বিষন্ন থাকবে, তাই তখন আর এত জার্নির ধকল সহ্য করার মানসিকতা অনেকেরই থাকবে না। সুতরাং আসার সময় পুরোটা আমরা ফিরবো এয়ারে।
তো ট্যুর মেম্বার এবং প্ল্যান তো ফাইনাল করেছিলাম, এবার সমস্ত টিকিট, হোটেল এবং কাশ্মিরের প্যাকেজ বুকিং করার প্ল্যান সামনে এসে পড়েছিল। কাশ্মিরের প্যাকেজ বুকিংয়ের ব্যাপারে একটু বলি। আমরা চাচ্ছিলাম, ঢাকা থেকে কাশ্মির পৌঁছানো পর্যন্ত এবং কাশ্মির থেকে ঢাকা ফেরা পর্যন্ত সবকিছু আমাদের নিজস্ব রেসপনসিবিলিটিতেই করবো। মানে বাস, বিমান এবং ট্রেনের টিকিটগুলো আমরা নিজেরাই অথবা কোনো এজেন্ট দিয়ে করে ফেলবো। কিন্তু কাশ্মিরে আমরা যে কয়দিন থাকবো, সেই কয়দিনের জন্য আমরা কাশ্মিরের লোকাল কোনো এজেন্ট থেকে একটা প্যাকেজ নেব। এটা আমরা এজন্যে করতে চেয়েছিলাম যে, যাতে করে কাশ্মিরে পৌঁছার পর আমরা সব কিছু রেডি পাই। অর্থাৎ কাশ্মিরের হোটেল বুকিং, যে গাড়ি নিয়ে ঘুরবো সেটা, হাউসবোট বুকিং এবং খাওয়া-দাওয়া এইসমস্ত কিছু যেন আগে থেকেই একজনের সাথে কন্ট্রাক্ট করা থাকে। আমরা জাস্ট কাশ্মিরে পৌঁছেই তার সার্ভিস নিয়ে ঘোরাঘুরি আরম্ভ করে দেব। এজন্য যেন আমাদের বাড়তি টেনশন বা ওগুলো ঠিক ঠাক করতে গিয়ে সময় নষ্ট না করা লাগে।
তো সেভাবেই আমরা আগাতে চেষ্টা করলাম। মানে প্ল্যানের প্রথম পর্যায়ে আমরা যাত্রা শুরুর তিনমাস আগে থেকেই বাস, ট্রেন এবং বিমানের টিকিট বুকিংয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিলাম। বলে রাখা ভালো, প্রথমে ঢাকা থেকে কোলকাতা যাবার জন্য আমরা ট্রেন বেছে নিয়েছিলাম। মৈত্রী এক্সপ্রেস। যা বনানী ক্যান্টনমেন্ট থেকে সকাল ৮:১৫ মিনিটে কোলকাতার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং কোলকাতার চিতপুর স্টেশনে গিয়ে পৌঁছে সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ। কিন্তু সমস্যা হলো এই ট্রেনের টিকিট তিনমাস আগে থেকে পাওয়া যায়না। এটা কিনতে হয় যাত্রা শুরুর ২৯ দিন আগে কমলাপুর স্টেশনের কাউন্টার থেকে। তাই আমরা তিনমাস আগে থেকে সমস্ত টিকিট করে রাখার প্ল্যান করলেও, শুধু মাত্র ঢাকা থেকে কোলকাতা যাবার জন্য মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকিট কাটার ব্যাপারটা পেন্ডিং রাখলাম। ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখলাম এটা মনে রাখার জন্য যে, ঠিক যেন ২৯ দিন আগেই কমলাপুর গিয়ে টিকিটগুলো করে ফেলতে পারি। কারণ দেরী করলে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
এছাড়া বাকি সবকিছুর, যেমন কোলকাতা থেকে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে জম্মু যাবার ট্রেনের টিকিট এবং কাশ্মির এবং ঢাকা আসা পর্যন্ত বিমানের টিকিট আমরা করে রাখতে চাইলাম তিনমাস আগে থেকেই। কিন্তু সমস্যা হলো আরেক জায়গায়। আমরা নিজেরা বিমানের টিকিট করতে পারলেও ইন্ডিয়ান ট্রেনের টিকিট বাংলাদেশ থেকে করতে পারছিলাম না। একেবারে অসম্ভব যে ছিল তাও না। এজন্য ইন্ডিয়ান রেলওয়ে অথরিটি মানে IRTC’র ওয়েবসাইটে ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করে তারপর সেটা কিনতে হবে। কিন্তু তার জন্য আবার ইন্ডিয়ান কোনো ফোন নম্বর রিকয়ার্ড দেখাচ্ছিল। তাই আমরা এত ঝামেলায় গেলাম না। আমরা খুঁজে বের করলাম ইন্ডিয়ান কোনো এজেন্টকে। যার মাধ্যমে আমরা এগুলো সহজেই করতে পারবো। সে ইন্ডিয়া থেকেই এগুলো আমাদের জন্য কনফার্ম করে ফেলবে। আমরা বাংলাদেশের কিছু এজেন্সি থেকেও এগুলো করতে পারতাম। কিন্তু বাংলাদেশের এজেন্সিগুলো ভাড়া কিছুটা বেশি দাবী করছিল। তবে তাদের দাবিটা অবশ্য যৌক্তিক ছিল। কিন্তু আমরা তাদের দ্বারা করিনি। কারণ আমাদের একজন এজেন্ট ছিলেন, যার বাড়ি কোলকাতায়। তিনি এসব ব্যাপার ভালোমত হ্যান্ডল করেন এবং তাকে চোখবুঝে বিশ্বাস করা যায়। অমায়িক লোক। তার নাম জাওয়েদ ভাই। আমার প্রথম কাশ্মির যাত্রায় তার কাছ থেকেই প্যাকেজ নেয়া ছিল। পরিচয় সেখান থেকেই।
তো আমরা জাওয়েদ ভাইয়ের শ্মরনাপন্ন হলাম। তাকে ফেসবুকে নক করে আমাদের চাহিদা জানালাম। তিনি কয়েকদিন সময় নিয়ে আমাদের টিকিটগুলো করে দিলেন। কোলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত যেতে রাজধানী এক্সপ্রেসের থ্রি টায়ার এসির টিকিটের মূল্য নিলেন তিনি জনপ্রতি ২৮৫০ টাকা করে। এর ভিতর খাবার সকালের ব্রেকফাস্ট আর রাতের খাবার ইনক্লুড করা ছিল। তিনি টিকিট প্রতি আমাদের কাছ থেকে ১৬০ টাকা করে তার চার্জ নিয়েছিলেন। এটা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। আর দিল্লি থেকে জম্মুর দূরন্ত এক্সপ্রেসের টিকিট প্রতি তিনি আমাদের কাছ থেকে থ্রি টায়ার এসির টিকিট মূল্য নিয়েছিলেন ১১৫০ টাকা করে। আমি বাংলা টাকার হিসাব বলছি। এবং যথারীতি জম্মুর টিকিটের জন্যও উনি সার্ভিস চার্জ নিয়েছিলেন প্রতি টিকিটে ১০০ টাকা করে। যা স্বাভাবিক ছিল।
এবং সবশেষে তিনি করে ফেললেন শ্রীনগর থেকে কোলকাতা ফেরার বিমানের টিকিট। এটা ছিল ভিস্তারা এয়ারলাইন্সে। টিকিট মূল্য ছিল জন প্রতি সব মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার টাকার মত। খাবার ইনক্লুড করা ছিল। অন্য এয়ার লাইন্সে আমরা আরো অনেক কমে পেতাম, সেই অপশনও তিনি আমাদের দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ভিস্তারাতেই করতে চাইছিলাম।
আর কোলকাতা থেকে ঢাকায় ফেরার টিকিট আমরা নিজেরাই করেছিলাম। বলাবাহুল্য এই টিকিট আমরা আগে থেকে করতে চাইনি। মানে কোলকাতা থেকে এয়ারে ফেরার টিকিট আমরা আগে থেকে করতে চাইনি। কারণ আমরাদের ফেরার ডেট নিয়ে একটু দ্বিমত ছিল। ফেরার দিন কোলকাতায় কেউ কেউ দুইদিন থাকতে চেয়েছিল আবার কেউ কেউ একদিন থাকতে চেয়েছিল। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নেই যাবার সময় কোলকাতা পৌঁছে তারপর ভেবেচিন্তে ফেরার এয়ার টিকিট করে ফেলবো। আমরা জানতাম তাতে ভাড়া বেশি পড়ে যাবে। কিন্তু কিছু করার ছিলনা। আর সেই ওভাবেই টিকিট করতে গিয়ে আমাদের কোলকাতা থেকে ঢাকায় ফেরার রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের টিকিট মূল্য ছিল জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে।
যাইহোক, ঢাকা থেকে কোলকাতা যাবার মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকিট এবং কোলকাতা থেকে ঢাকায় ফেরার বিমানের টিকিট বাকি রেখে আমরা সমস্ত টিকিট কনফার্ম করে ফেললাম। এবার টেনশন করতে থাকলাম, কাশ্মিরের প্যাকেজ কার থেকে নেব এবং কোলকাতা এবং দিল্লির হোটেল কিভাবে বুকিং করবো। হোটেল বুকিংয়ের জন্য আমি Booking.com এর সাহায্য নিলাম। আমার নিজের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কোলকাতার ফ্যাব হোটেল নামের একটি হোটেলে বারো জনের জন্য ছয়টি এসি রুম বুকিং দিলাম এবং দিল্লির Aura হোটেল নামে একটি হোটেলে চারটি রুম বুকিং দিলাম। ক্রেটিড কার্ড ইউজ করেছিলাম কিন্তু কোনো পে করিনি। এটা ছিল জাস্ট বুকিং। কন্ডিশন ছিল আমরা ওখানে পৌঁছে পে করবো।
হোটেল বুকিংয়ের টেনশন থেকে বের হয়ে এবার আমরা তোড়জোড় শুরু করে দিলাম কাশ্মিরের ৫ রাত ছয়দিনের প্যাকেজটা বুকিং করার জন্য। আমি একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করলাম। কিভাবে কার প্যাকেজ নিতে পারি এ ব্যাপারটা জানতে। আমাকে কিছুক্ষণ পর একজন মেসেঞ্জারে নক করলো। তিনি ছিলেন কাশ্মিরের একজন ট্যুর এজেন্ট। তিনি আমাদের বারো জনের এই প্যাকেজটা দিতে চান। তার সাথে কয়েকদিন ধরে চললো আমাদের দর কষাকষি। এর মাঝে অবশ্য আরো কয়েকজন নক করলো। কিন্তু আমরা তাদের পেন্ডিংয়ে রাখলাম। মোটামুটি প্রথম জনের সাথেই আমাদের ফাইনাল হয়ে গেল। আমরা দিল্লি থেকে জম্মু স্টেশনে পৌঁছার পর থেকে তার সার্ভিস শুরু হবে। সকালবেলা জম্মু স্টেশন পৌঁছার পর সে একটি গাড়ি পাঠাবে আমাদের রিসিভ করতে। সেই গাড়ি আমাদের নিয়ে চলে যাবে শ্রীনগর। যা ছিল প্রায় ৮/১০ ঘন্টার পথ। তারপর কাশ্মির আমরা যে কয়দিন থাকবো এবং যেসব জায়গায় ঘুরবো সবসময় এই গাড়ি আমাদের সাথেই থাকবে এবং শেষের দিন আমাদের এই গাড়ি করেই শ্রীনগর এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসবে। এটা গেল প্যাকেজের গাড়ির কথা। এরপর কাশ্মিরের আমরা যে যে জায়গায় স্টে করবো সেখানকার টু স্টার মানের হোটেল রুম এবং সকালের ব্রেকফাস্ট এবং রাতের ডিনারও ছিল এই প্যাকেজের আওতায়। ছিল হাউসবোটের ভাড়াও। ছিলনা শুধু কোনো পার্কে ঢোকার এন্টি্র ফি। দুপুরের খাবার। গুলমার্গের গন্ডোলা রাইডের ফি। আরুভ্যালি, বেতাবভ্যালী এবং চান্দনওয়ারী ঘোরার জন্য লোকাল ইউনিয়ন কারের ভাড়া এবং বাইসারান যাওয়ার জন্য ঘোড়া ভাড়া। আমরা খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলাম, প্যাকেজগুলো মূলত এরকমই থাকে। আমাদের টোটাল প্যাকেজ মূল্য পড়েছিল ১৫০০০ টাকা। তবে আপনারা চাইলে প্যাকেজমূল্য আরো একটু মিনিমাইজ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনারা হোটেল এবং হাউসবোটের মানের ব্যাপারটা একটু ছাড় দেবেন এবং খাবারের ব্যাপারটা যদি নিজেরাই বহন করেন। আমরা সেই ট্যুর এজেন্টের কাছ থেকে প্যাকেজ ফাইনাল করলাম। তিনি আমাদের কিছু টাকা এ্যাডভান্সড করতে বললেন। এখানে একটু দ্বিধা-দ্বন্দ কাজ করলো। আমরা তো তাকে কিছুই জানিনা। পরিচয় কেবলমাত্র ফেসবুকে। মাঝে মাঝে হিন্দিতে ম্যাসেঞ্জারে কিছু বাতচিত হতো। ওই পর্যন্তই । তবে সে বিশ্বাস অর্জন করার জন্য আমাদের কিছু কিছু লোকের রেফারেন্স দিলেন। যারা তার প্যাকেজ নিয়েছিলেন এবং তারা বাংলাদেরশই লোক। আমরা আর ওই রেফারেন্সের যাচাই বাছাই করলাম না। ইচ্ছা করেই করিনি। আমরা আসলে বিশ্বাস করতে চাইছিলাম। বিশ্বাসের উপর তো আর কিছু নেই। মানুষ হয়ে মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকার মাঝেও অনেক কিছু শেখার আছে। তো আমরা সেই বিশ্বাসের উপর ভর করেই তাকে কিছু টাকা এ্যাডভান্সড করে দিয়েছিলাম। তিনি কি আমাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিলেন? সেই গল্প পড়ে বলবো।
সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম কাঙ্খিত দিনটির জন্য। কিন্তু আপনাদের কি মনে আছে? ঢাকা থেকে কোলকাতা যাবার জন্য কিন্তু আমরা মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকিট তখনও কাটতে পারিনি। কারণ ওটা করতে হবে যাত্রার ২৯ দিন আগে। ৩০ দিন আগে গেলেও ওই টিকিট পাবোনা। সুতরাং আমরা পাশাপাশি ওই যাত্রার ২৯ দিন আগে কত তারিখ হয় সেটার জন্যও অপেক্ষা করছিল।
আমাদের বারোজন ট্যুর মেম্বারের দু তিনজনের ইন্ডিয়ান ভিসা তখনও ছিলনা। তারা ওই ফাঁকে ভিসার জন্য এপ্লাই করা শুরু করে দিল। কিছুদিনের ব্যবধানে সবার ভিসা হয়েও গলে। এবার আর কিছুই করার নেই। অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আর অপেক্ষা করতে করতেই আমাদের সেই মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কাটার দিন চলে এলো। মানে যাত্রার ২৯ দিন আগের সেই দিনটি। সেই দিনটি ছিল শুক্রবার। আমরা প্রথমবারের মত একটা ভুল করলাম। টিকিট কাটার ২৯ দিন আগের দিনটি শুক্রবার হওয়ায় আমরা সেদিন আর কমলাপুর গেলামনা টিকিট কেনার জন্য। ভাবলাম আগামীকাল অর্থাৎ শনিবার যাবো। সেটা ছিল যাত্রার ২৮ দিন আগে। শনিবার সকালবেল রওনা দিয়ে কমলাপুর গিয়ে কাউন্টার থেকে যা শুনলাম তাতে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। টিকিট শেষ। মানে আমরা যে ডেটে কোলকাতা যাবার টিকিট কাটতে চেয়েছিলাম সেই টিটিক গতকাল মানে ২৯ দিন আগে যখন প্রথম টিকিট ছাড়ে সেদিনই শেষ হয়ে গেছে তাও দুপুর এগারোটার মধ্যেই। হায় হায়। এবার কি হবে? আমরা ভেবেছিলাম মাত্র একদিনের ব্যবধানে কোনো সমস্যা হবেনা। টিকিট পাবো। কিন্তু টিকিট না পেয়ে আমরা বড় একটি শিক্ষা পেয়ে ফিরে চলে এলাম। আমরা যদি যাত্রার তারিখ একদিন পিছিয়ে দিতাম তবে টিকিট পেতাম। কিন্তু সেটা করার কোনো সুযোগ ছিলনা আমাদের হাতে। কারণ ওদিকে আবার কোলকাতা একদিন পরে পৌঁছলে আমাদের কোলকাতা থেকে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে জম্মু যাবার ট্রেন সিডিউল বিপর্যের মুখে পড়বে। মানে আমরা ট্রেন মিস করবো। সুতরাং ওই চিন্তুা বাদ। মানে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকা থেকে কোলকাতা যাবার প্ল্যান আমাদের ভেস্তে গেল। আমরা বিষন্ন মনে ফিরে এলাম। ফিরে আসতে আসতেই আমরা প্ল্যান করলাম ঢাকা থেকে কোলকাতা যাবো বাসে করে। পরদিনই আমরা ঢাকার কলাবাগান শ্যামলী সৌহার্দ্র বাসের কাউন্টারে গেলাম টিকিট করতে। এই বাসটি সম্পর্কে আমরা কিছুটা খোঁজখবর নিয়ে জানলাম এই বাসটি সরাসরি ঢাকা থেকে বেনাপোল বর্ডার পার হয়ে কোলকাতা যায়। যা অন্য কোনা বাস যায়না। অর্থাত এই বাসে গেলে বর্ডারে আমাদের আর বাস চেঞ্জ করে অন্য বাসে উঠতে হবেনা। সেটা একটা ঝামেলার ব্যাপার। যাবার সময় আমরা এত ঝামেলার ভিতর দিয়ে যেতে চাইলাম না। তাই ১৯০০ টাকা করে শ্যামলী সৌহার্দ্র হুন্দাই এসি বাসের টিকিট করলাম। সেই টিকিটেরও ক্রাইসিস ছিল। আমরা ছিট পেলাম একদম পিছনের সারির কয়েকটা রো তে। তাই করে ফেললাম। আমাদের কাছে আর কোনো অপশন ছিলনা।
এবার সব কমপ্লিট হয়ে গেল। এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর মাঝে মাঝে আমাদের কাশ্মিরের এজেন্টের সাথে যোগাযোগ রাখা ছাড়া আর কিছু করার ছিলনা।
এর মাঝে একটা কথা বলে রাখি। আমরা যখন আমাদের ট্যুর প্ল্যান করেছিলাম সেটা ছিল জানুয়ারী মাস। আর ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝিতে এসে কাশ্মিরে পুলওয়ামা এ্যাটাক হয়। পুরো জম্মু কাশ্মির তখন শাটডাউন হয়ে যায়। আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি আমাদের ট্যুর নিয়ে। শেষ পর্যন্ত যেতে পারবো কিনা তা অনিশ্চিত হয়ে যায়। যদিও আমাদের যাত্রার তারিখ তখনও ছয় মাস পরে ছিল। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত অচলাবস্থা চলতে থাকে। এপ্রিলে এসে আমরা যখন সমস্ত কিছুর বুকিং কনফার্ম করছিলাম তখনও কিছুটা দ্বিধা কাজ করছিল আমাদের মাঝে। সব কি আদৌতে ঠিক হবে? আমরা কি যেতে পারবো? নাকি সব ক্যান্সেল করে লোকসান গুনতে হবে? কিন্তু আমাদের সাহস দিয়ে যাচ্ছিলেন সেই কাশ্মিরের এজেন্ট। হতে পারে এতে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত ছিল, কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়েছে তিনি আমাদের একজন শুভাকংখি হয়েই সাহস দিচ্ছেন। আমরাও আমাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলো। আমরা দিন গুনতে থাকলাম। রোজা চলে এলো। আমাদের যাত্রার তারিখ ছিল রোজার ইদের একদিন পরেই। কিন্তু ঈদ কত তারিখে হবে সেটা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা ছিল। কিন্তু এই সমস্ত ধোঁয়াশা আর দ্বিধা-দ্বন্দকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ঠিক ঠিক আমাদের যাত্রার সময় চলে এলো। আমরা চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম স্বপ্নের পথে যাত্রার উদ্দেশ্যে।
এর পরের গল্প আরো চমকপ্রদ আর এ্যাডভেঞ্চার পূর্ণ। লেখার ব্যাপ্তি বড় হয়ে যাচ্ছে। আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি তাই। পরের পর্বে বলবো বাকি গল্প। সে পর্যন্ত আপনারা সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ্য থাকবেন।
---------------------------------
আমার পুরো কাশ্মির ট্যুরের ধারাবাহিক ভিডিও দেখতে এই লিংকে ক্লিক করতে পারেনঃ https://bit.ly/2p5lxxZ
===================
সবশেষে একটা কথা বলি, ট্যুরিস্ট প্লেসগুলো চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল ইত্যাদি ফেলে কখনেই নোংরা করবেন না। এগুলো আমাদের সম্পদ তাই এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব ও আমাদের। নিজে পরিবেশ নোংরা করা থেকে বিরত থাকুন অন্যকেও বিরত রাখুন।
সবশেষে একটা কথা বলি, ট্যুরিস্ট প্লেসগুলো চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল ইত্যাদি ফেলে কখনেই নোংরা করবেন না। এগুলো আমাদের সম্পদ তাই এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব ও আমাদের। নিজে পরিবেশ নোংরা করা থেকে বিরত থাকুন অন্যকেও বিরত রাখুন।
Credit: Rajib Ferdous




No comments:
Post a Comment